প্রয়াত গ্রান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমান ও দাবা ফেডারেশনের ভ্রাতৃত্বের গপ্পো

জিয়াউর রহমান মানুষ হিসেবে খুবই শান্ত ছিলেন। ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের দিকে যখন আমি ক্রিড়া সাংবাদিক ছিলাম, আমি মাঝে মাঝেই দাবা ফেডারেশনে যেতাম। দাবাড়ুদের দাবা বোর্ডের সামনে মগ্ন হয়ে বসে থাকতে দেখতাম। দাবায় নিমজ্জিত দাবাড়ুদের মাঝে ফেডারেশনের ভেতর সুনশান-নিস্তব্ধতা বিরাজ করত।

সেই সময়, নিয়াজ মোরশেদ, বাংলাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত দাবা খেলোয়াড় পুরোপুরি দাবা থেকে দূরে ছিলেন। ফেডারেশনের রাজনৈতিক জাতাকলে পড়ে ব্যাবসায়ীক কর্মকান্ডে নিজেকে ব্যস্ত রাখছিলেন নিয়াজ৷ সবমিলিয়ে জিয়া ছিল দাবা দলের অবিসংবাদিত নেতা। রিফাত বিন সত্তার ও অন্যান্য অনুজ গ্রান্ডমাস্টার – আব্দুল্লাহ আল রাকিব ও এনামুল হোসেন রাজিবদের সাথে, জিয়া তার কাধে দেশের দাবার প্রত্যাশা বাচিয়ে রেখেছিলেন। ফিদে র‍্যাঙ্কিংয়ে আরও ভালো করার আশা জাগিয়ে তিনি প্রতিবারই কিছু দুর্দান্ত খেলা দেখাতেন। কিন্তু এটা বেশিদিন টেকেনি। গ্লোবাল সার্কিটে সর্বাত্মক চেস্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু বাড়ি থেকে যথেষ্ট সমর্থনের অভাব, দাবার প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদীর অভাব যেগুলো ভারত, ইরান এমনকি মধ্য এশিয়ার গরীব, নিন্মমধ্যবিত্ত দেশগুলাতেও আছে; সেগুলো না থাকায় জিয়া, রিফাত, রাকিব, রাজিবরা বেশিদূর যেতে পারেনি৷ সম্ভবত নিয়াজ ক্যারিয়ারের প্রথমদিকেই এসব বুঝে গিয়েছিলেন। নতুন প্রজন্মের দাবাড়ুদের দেখাশোনা করার পরিবর্তে সে দিলকুশার স্পোর্টিং অ্যারেনা থেকে দূরে থাকে। কিন্তু জিয়া কখনো হাল ছাড়েনি৷ কখনো থেমে যায়নি বরং দৃঢ়ভাবে লড়াই করে গেছেন। দাবাকে জিয়া সবকিছুর চেয়ে ভালোবাসত। দাবা ছিল তার জীবন, মৃত্যু বা সম্ভবত তার চেয়েও আরো অনেক কিছু।

জিয়াকে কিছুটা ভাগ্যবানও বলা যায় – কারণ জিয়া ফেডারেশনের অনেকের সাথের একটা ভ্রাতৃত্ব গড়ে তুলেছিলেন যারা জিয়াকে কখনো পরামর্শদাতা, কখনো অগ্রজ বা কখনো বিপদের সময়ে পাশে থাকা ব্যক্তি৷ নিরাশা অনেকের জন্যই আশির্বাদের মত ছিল কারণ কারোরই আন্তর্জাতিক খ্যাতি তেমন ছিলনা। হতাশায় ও অর্থনৈতিক ভাবে সহায়তা না পাওয়ায় প্রায়শই সম্ভাবনাময়ী ও ভালো খেলোয়াড়রা জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারতনা। উপযুক্ত উদীয়মান খেলোয়াড়দের অভাব অনেক প্রতিযোগিদের আশাহত করত। তুমি যদি আগে থেকেই জানো তুমি সব কমবয়সী ও নতুন খেলোয়াড়দের সাথে জিতে যাবে তাহলে কেন বছর বছর তুমি তাদের বিরুদ্ধে খেলে যাবে? দাবা ফেডারেশনের টালমাটাল অবস্থা একটাসময় জিয়া ও তার ভ্রাতৃত্বের মাঝে ফাটল ধরায়। ফলাফল? অনেকে আস্তে আস্তে ফেডারেশনে আসতনা৷ জিয়া কখনো আশা ছেড়ে দেয়নি৷ মিটিংয়ে ও সাক্ষাতে সে তার স্ত্রী ও ছেলেকে আনত। তার ছেলে তার সাথে যোগ দিলে সে সবচেয়ে খুশি ছিল। ছেলের বয়সী সবার খেলা জিয়া দেখত, পর্যবেক্ষণ করত। তারা তাদের বয়সে জিয়া যেমন ছিল, তেমন ভালো খেলতনা। কিন্তু জিয়া তাতেই প্রচুর আশাবাদী ছিল; আশাবাদী ছিল অন্য গ্রান্ডমাস্টাররাও।

হারিয়ে যেতে থাকা ভ্রাতৃত্বের নতুন গন্ধে দাবা ফেডারেশন আবারো মৌ মৌ করতে থাকে। অর্থনৈতিক সমস্যা তখনো দূর হয়নি। কিন্তু অনেকের জন্য টাকাপয়সা কোনো ব্যাপার ছিলনা। অবশেষে জিয়ার সারাজীবন ধরে খোজা সেই পরিবেশ পেয়ে গেলেন। তার মৃত্যু আমাদের দাবা কমিউনিটির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা একজন সৎ, অমায়িক ও দাবার কাছে নিজেকে পুরোপুরি বিলিয়ে দেয়া একজন মানুষকে হারিয়েছি। দেশের প্রতিটি দাবাড়ু তাকে মিস করবেন। কিন্তু খেলার প্রতি তার ভালোবাসা — দাবা বোর্ডে তার শেষ নিঃশ্বাসের উদাহরণ — দেশের প্রতিটি ক্রীড়াবিদকে অনুপ্রাণিত করবে। যদি তুমি কোনো খেলাকে ভালোবাসতে চাও, জিয়ার মত ভালোবাসো। সে কখনো হাল ছেড়ে দেয়নি। ওপারে ভালো থেকো, প্রিয় গ্রান্ডমাস্টার!!

(লিখেছেন – শফিকুল ইসলাম।অনুবাদে – রাকিব উল ইসলাম)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *