ক্রিকেট ইতিহাসের নতুন দিগন্তে মিচেল স্টার্ক, ছাড়িয়ে গেলেন ওয়াসিম আকরামকেও

টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা, নিবেদন, আত্মত্যাগ- এ শব্দগুলো আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। কিন্তু কতজন সত্যিই এগুলোর মর্যাদা রক্ষা করেন? আধুনিক ক্রিকেটের তীব্র প্রতিযোগিতার ভিড়ে এমন একজনকে খুঁজে পাওয়া কঠিন যিনি টেস্টকে হৃদয়ের ধ্বনি হিসেবে ধারণ করেন। ঠিক সেখানেই ব্যতিক্রমের আলো ছড়ান মিচেল অ্যারন স্টার্ক।

প্রত্যেক ক্রিকেটারের নিজস্ব পথ থাকে- কেউ টেকনিককে গুরুত্ব দেন, কেউ বিশ্রামকে, কেউ মানসিকতা নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু স্টার্কের পথটা যেন অন্যরকম। বছর বছর তিনি নিজেকে যেভাবে টেস্ট ক্রিকেটের জন্য গড়ে তুলেছেন, তা একেবারে অবিশ্বাস্য। বাণিজ্যিক ক্রিকেটের যুগে এতটা ধারাবাহিক নিষ্ঠা সত্যিই বিস্ময় জাগায়।
আইপিএলের উদাহরণটিই ধরুন। ২০১৪-এর আসরে ছিলেন দারুন ছন্দময়, ২০১৫-তে ছিলেন আরো দুর্দান্ত। তারপরও তিনি পরপর আটটি মৌসুমে আইপিএল থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন! কারণ? টাকা নয়, আলো নয়, জনপ্রিয়তা নয়- তার প্রথম ও শেষ লক্ষ্য ছিল অস্ট্রেলিয়ার জার্সি গায়ে টেস্ট ক্রিকেটে শতভাগ দেওয়া। কখনও তিনি চোটের সঙ্গে লড়েছেন, কখনও আবার নিজের ইচ্ছাতেই আইপিএলের দরজা বন্ধ করেছেন। তিনি চেয়েছেন শরীরকে বিশ্রাম দিতে, মানসিক ক্লান্তিকে দূরে সরিয়ে রাখতে। পরিবারের পাশে সময় কাটিয়ে আবার টেস্টের কঠিন লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে। এমন সিদ্ধান্ত যে কতটা বড়, তা কেবল একজন ক্রিকেটারই বুঝতে পারেন। বিশ্বজুড়ে যেখানে কোটি টাকার প্রলোভনে ক্রিকেটাররা নিলামে প্রতিযোগিতায় ঝাঁপাচ্ছেন, সেখানে স্টার্ক ছিলেন একান্ত আলাদা। চোখধাঁধানো টাকার অফারকে ঠান্ডা মাথায় ‘না’ বলে তিনি নিজের পথেই হাঁটলেন, যা সত্যিই অনন্য।

অবশেষে যখন তিনি মনে করলেন “এবার সময় এসেছে”, তখনই শুরু হলো প্রতিযোগিতা। নিলামে রেকর্ড ২৪ কোটি ৭৫ লাখ রুপিতে দল পেলেন। আগের মৌসুমে পেয়েছিলেন ১১ কোটি ৭৫ লাখ। এর মাঝেই একাধিক মৌসুমে লাখো-কোটি ডলার উপার্জনের সুযোগ তিনি ঝরিয়ে দিয়েছেন নিজের বিশ্বাসের কাছে মাথা নত করে। তার জীবনযাত্রার এই অধ্যায় শুধু একটি উদাহরণ মাত্র। টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি তার টান, তার দৃঢ় মানসিকতা এগুলোই তাকে দলের অন্যতম স্তম্ভে পরিণত করেছে। ওয়ানডের মতো ফরম্যাটে তিনি সর্বকালের সেরাদের একজন হয়েও ১৫ মৌসুমে খেলেছেন মাত্র ১৩০টি ম্যাচ। আর টি-টোয়েন্টিতে ১২ বছরে মাত্র ৬৫টি! অথচ টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন ১০২টি, যা নিজেই বলে দেয় তিনি কাকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন। তার এই নিবেদনই তাকে টেস্ট ক্রিকেটে ইতিহাসের সর্বকালের সফলতম বাঁহাতি পেসার হিসেবে পরিগণিত করেছে। যে পথ ধরে তিনি এসেছেন, তা শুধু ক্রিকেটীয় অর্জনের পথ নয়- এটি এক ধরনের আত্মত্যাগ, এক ধরনের নৈবেদ্য।

টেস্টে ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত বাঁহাতি পেসারদের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির তালিকাঃ

মিচেল স্টার্ক – ৪১৫ উইকেট (১০২ টেস্ট)
ওয়াসিম আকরাম – ৪১৪ উইকেট (১০৪ টেস্ট)
চামিন্দা ভাস – ৩৫৫ উইকেট (১১১ টেস্ট)
ট্রেন্ট বোল্ট – ৩১৭ উইকেট (৭৮ টেস্ট)
মিচেল জনসন – ৩১৩ উইকেট (৭৩ টেস্ট)
জাহির খান – ৩১১ উইকেট (৯২ টেস্ট)
নিল ওয়্যাগনার – ২৬০ উইকেট (৬৪ টেস্ট)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *