বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স ও মরক্কোর মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত লড়াই শুরু হওয়ার আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন ম্যাচের মূল রেফারি আর্জেন্টিনার ফ্যাকুন্দো তেয়ো। কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য পরিচিত এই রেফারির অতীত রেকর্ড নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কারণ, ফুটবল ইতিহাসে এক ম্যাচে ১০টি লাল কার্ড দেখানোর বিরল ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নাম।
বিশ্বকাপের এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে থাকছেন আর্জেন্টিনার পাঁচ সদস্যের একটি রেফারিং প্যানেল। বিশ্বকাপের মতো আসরে একই ম্যাচে একটি দেশের এতজন রেফারির দায়িত্ব পাওয়ার ঘটনা খুব একটা দেখা যায় না। তবে সবচেয়ে বেশি নজর থাকছে মূল রেফারি ফ্যাকুন্দো তেয়োর দিকে, যিনি নিয়ম প্রয়োগে কোনো ধরনের ছাড় দেন না বলেই পরিচিত।
ফুটবল বিশ্বে তেয়ো সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন ২০২২ সালের আর্জেন্টাইন ট্রফেও দে কাম্পেওনেসের ফাইনালে। বোকা জুনিয়র্স ও রেসিং ক্লাবের মধ্যকার সেই উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। নির্ধারিত সময় ১-১ গোলে শেষ হওয়ার পর ১১৮তম মিনিটে রেসিং ক্লাবের হয়ে জয়সূচক গোল করেন কার্লোস আলকারাস। গোলের পর বোকা জুনিয়র্সের সমর্থকদের সামনে উদযাপন করতে গেলে দু’দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তেই পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কঠোর অবস্থান নেন তেয়ো। সংঘর্ষের পরপরই তিনি একসঙ্গে ছয়টি লাল কার্ড দেখান। এর মধ্যে পাঁচটি ছিল বোকা জুনিয়র্সের খেলোয়াড়দের উদ্দেশে। গোলদাতা আলকারাসও লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। এমনকি বেঞ্চে থাকা রেসিং ক্লাবের খেলোয়াড় জোনাথন গালভানকেও লাল কার্ড দেখানো হয়, যদিও তিনি তখনও মাঠে নামেননি।
এর আগেও ম্যাচে শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে দু’দলের খেলোয়াড়দের মাঠ ছাড়তে হয়েছিল। ৯৫তম মিনিটে হাতাহাতির ঘটনায় বোকা জুনিয়র্সের সেবাস্তিয়ান ভিলা ও রেসিং ক্লাবের ইয়োহান কার্বোনেরো সরাসরি লাল কার্ড দেখেন। এরপর ১০০তম মিনিটে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পেয়ে মাঠ ছাড়েন বোকার আলান ভারেলা। সব মিলিয়ে ম্যাচে মোট ১০টি লাল কার্ড দেখিয়ে ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য নজির গড়েন ফ্যাকুন্দো তেয়ো।
এতগুলো বহিষ্কারের ফলে ম্যাচের শেষ দিকে বোকা জুনিয়র্সের মাঠে খেলোয়াড়সংখ্যা নেমে আসে নিয়মে নির্ধারিত সর্বনিম্ন সীমার নিচে। ফিফার আইন অনুযায়ী, কোনো দলের খেলোয়াড় সংখ্যা সাতজনের কমে গেলে ম্যাচ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সে কারণে ম্যাচটি শেষ হওয়ার আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় এবং ফলাফল নির্ধারণ করা হয় তৎকালীন অবস্থার ভিত্তিতে
শুধু ওই ম্যাচই নয়, পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই কঠোর রেফারিংয়ের জন্য পরিচিত তেয়ো। ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া পর্যায়ে রেফারিং শুরু করার পর থেকে তিনি দুই হাজারের বেশি হলুদ কার্ড এবং ৭৫টিরও বেশি লাল কার্ড দেখিয়েছেন। নিয়ম প্রয়োগে তার আপসহীন অবস্থান তাকে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত রেফারিদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
চলতি বিশ্বকাপেও ইতোমধ্যে দুটি গ্রুপ পর্বের ম্যাচ পরিচালনা করেছেন এই আর্জেন্টাইন রেফারি। দুটি ম্যাচেই প্রয়োজন অনুযায়ী কার্ড ব্যবহারে তিনি দ্বিধা করেননি। ফলে ফ্রান্স ও মরক্কোর মতো উচ্চ-চাপের ম্যাচে খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে ফ্রান্সের কয়েকজন ফুটবলারের জন্য ম্যাচটি বাড়তি সতর্কতার। দলের আক্রমণভাগের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় মাইকেল ওলিসে যদি এই ম্যাচে হলুদ কার্ড দেখেন, তাহলে ফ্রান্স সেমিফাইনালে উঠলেও পরের ম্যাচে নিষেধাজ্ঞার কারণে তার খেলা হবে না। তাই প্রতিপক্ষের চাপ সামলানোর পাশাপাশি খেলোয়াড়দের নিজেদের আচরণ নিয়েও বাড়তি সচেতন থাকতে হবে
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ম্যাচগুলো এমনিতেই উত্তেজনায় ভরপুর থাকে। তার ওপর দায়িত্বে যদি থাকেন ফ্যাকুন্দো তেয়োর মতো কঠোর রেফারি, তাহলে মাঠে সামান্য অসংযমও বড় মূল্য ডেকে আনতে পারে। ফলে ফ্রান্স ও মরক্কোর কোয়ার্টার ফাইনালে ফুটবলের লড়াইয়ের পাশাপাশি রেফারির সিদ্ধান্তও যে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে, তা বলাই যায়।


