কথায় আছে ‘ক্রিকেট ভদ্র লোকের খেলা’ । কথাটার যদি কিঞ্চিত পরিমার্জন করে “ক্রিকেট হাশিম আমলা’র” খেলা বলা হয় তবে খুব একটা ভুল সম্ভবত হবে না।
‘একবার আমি প্লেটের খাবার শেষ করতে পারছিলাম না। খাবার রেখেই উঠে যাচ্ছিলাম, তখন আমলা আমার খাবার নিজের প্লেটে নিয়ে খেলে নিলেন। খাবার নষ্ট করা পছন্দ করতেন না।আমলার সবচেয়ে বড় ব্যাপার ছিল সে খেয়াল করতো সবার ভালো থাকা, খারাপ থাকা। প্রতিদিন খোঁজখবর নিতো।’
উপরোক্ত উক্তিগুলো দক্ষিণ আফ্রিকার পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট প্রসন্ন অ্যাগোরামের লেখা একটি কলামের, যিনি সেখানে আমলাকে তার দেখা ‘সেরা মানুষ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান হাশিম আমলা। শুধু দক্ষিণ আফ্রিকা নয়, বিশ্ব ক্রিকেটেও হাশিম আমলা অন্যতম সেরাদের একজন। ২০০৪ সালে আমলা যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে পা রাখেন তখন তাকে মনে করা হতো একজন টেস্ট ক্রিকেটার। মাঠে শান্ত চরিত্র এবং দৃঢ় ব্যক্তিত্বের কারণে এই ধারণা আরও ঝেঁকে বলেছিলো ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের মনে। আমলা হুট করে সফল হননি, তাকে নিয়ে প্রশ্ন ছিলো অনেক প্রশ্ন। কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর পিচে খেলার মাধ্যমে দিয়েছেন আমলা।টেস্ট ক্রিকেটে দক্ষিণ আফ্রিকার একমাত্র ট্রিপল সেঞ্চুরির মালিক হাশিম আমলা। টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও তিনি।

বিশ্ব ক্রিকেটে পাঁচজন ক্রিকেটারের একজন, যাদের রয়েছে টেস্ট ও ওয়ানডে উভয় ফরম্যাটে ২৭ টির বেশি সেঞ্চুরির কৃতি। হাশিম আমলা তাদের একজন। টেস্ট ও ওয়ানডে দুই ফরম্যাটেই ৪৬+ গড়ে ৮০০০ এর বেশি রান করা দুজন ব্যাটসম্যানের একজন হাশিম আমলা। একমাত্র প্রোটিয়া ব্যাটার হিসেবে ট্রিপল সেঞ্চুরি করার পথে দীর্ঘ ১৩ ঘণ্টা ব্যাট করে ৩১১ রান তুলে নট আউট ছিলেন সেই ম্যাচে। আমলা তখন ছিলেন র্যাংকিং অনুযায়ী শীর্ষ টেস্ট ব্যাটসম্যান। তিনি ওয়ানডে ক্রিকেটের দ্রুততম দুই হাজার, তিন হাজার, চার হাজার, পাঁচ হাজার, ছয় হাজার এবং সাত হাজার রান ছোঁয়ার রেকর্ডের মালিক। টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ব্যাটসম্যানদের তালিকায় থাকবেন তিনি অনায়াসে।অধিনায়ক হিসেবে আমলা প্রত্যাশিত সাফল্য পাননি, দক্ষিণ আফ্রিকা এখনও পর্যন্ত কোন বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। কিন্তু ২০১১ সালে হাশিম আমলার নেতৃত্বে দক্ষিণ আফ্রিকা পেয়েছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের সেরা টেস্ট দলের খেতাব।প্রায় ২ দশকের ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ১১২ সেঞ্চুরিতে, ৩৮ হাজারের বেশি রান সংগ্রাহক হাশিম আমলা ৩৭ বছরে যখন স্থায়ীভাবে প্যাভিলিয়ানে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। স্বদেশী সতীর্থ এবি ডি ভিলিয়ার্সের এক আবেগঘন একটি বার্তা টুইটারে বেশ আলোড়ন ফেলেছিলো। তিনি লিখেছিলেন, “হাশিম আমলা.. কোথা থেকে শুরু করা যায়? হয়তো দিন, সপ্তাহ, মাস বা বছর লেগে যাবে। আমি তোমাকে নিয়ে হয়তো গোটা একটা বই লিখে ফেলতে পারবো, মানুষ হিসেবে আমি সবচেয়ে নিরাপদবোধ করতাম আমলার কাছে।”
একজন সফল ক্রিকেটারের পাশাপাশি মানুষ হিসেবে আমলা ছিলেন যেমন অমায়িক, একজন মুসলিম হিসেবে তিনি ছিলেন ততটাই ধর্মভীরু ও আদর্শ। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল একটি অ্যালকোহল বেভারেজ কোম্পানি, আমলা জরিমানা দেওয়া সাপেক্ষে সচেতনভাবেই জার্সিতে ওই কোম্পানির লোগো এড়িয়ে চলতেন। রমজান মাসে রোজা রেখে দীর্ঘক্ষণ ব্যাটিং করে যেতেন আমলা। জনপ্রিয় আম্পায়ার আলিম দার একবার বলেছিলেন, আমলাকে দেখে তিনি দাড়ি রাখা শুরু করেন, “যাতে করে মানুষ জানে যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শীর্ষ পর্যায়ে একজন মুসলমান আম্পায়ারিং করে।”২০২১ সালে প্যালেস্টাইনে হামলায় সাধারণ মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় হাশিম আমলা ইন্সটাগ্রামে প্রতিবাদ জানিয়ে লিখেছিলেন, “নেলসেন ম্যান্ডেলা আজীবন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন। ফিলিস্তিনের স্বাধীন না হলে দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষের এতো বছরের সংগ্রাম অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।” পিচে আমলা ছিলেন সেরাদের একজন। ফরম্যাট, প্রতিপক্ষ কিংবা উইকেটের ধরণ – কোন কিছুই তার ব্যাটিংয়ে খুব একটা প্রভাব ফেলেনি। আমলাকে ‘কিংবদন্তী’ ক্রিকেটার মনে করেন অনেকেই এবং পরিসংখ্যানও এই খেতাবের পক্ষে কথা বলবে। ১৯৮৩ সালের ৩১ মার্চ ডারবানের নাটাল অঙ্গরাজ্যে এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ৪০ তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা হাশিম মুহাম্মদ আমলা।
এসকে/এমওয়াই


