আমরা আর্জেন্টিনা, আমরা একটি পরিবারের থেকেও বেশি

কোপা আমেরিকা শুরু হতে আর বেশি দিন বাকি নেই, যেখানে প্রথমবারের মতো লিওনেল আন্দ্রেস মেসিকে শিরোপা টাইটেল রক্ষা করতে নামতে হবে যেটি কিনা লিওনেল স্ক্যালোনির শিষ্যরা ২০২১ সালের ১০ই জুলাই রিও ডে জেনেরিও এর মারাকানায় জিতেছিল। যেখানে জন্মেছিল দেড় বছরের মতো যাত্রা যা আমাদেরকে আজকে বুঝতে শিখিয়েছে কেনো জীবনযাপন করছি কিভাবে তা আমরা আত্মউপলব্ধি করছি, ও এই ভালোবাসার উদ্দেশ্য কী যেটা আমরা অনেক সময় বিভিন্নভাবে পেয়েছি।

সেই রাতে এমন কিছু হয়েছিল যাতে করে আর্জেন্টিনা ব্রাজিলকে পরাজিত করে, ১-০ এর ব্যবধানে একটি অভিশাপ ভেঙে দিয়ে, প্রায় শূন্য স্টেডিয়ামে সর্বোচ্চ ২০০০ ফ্যানদের উপস্থিতিতে। কোভিড এর বাজে প্রভাব তখনও পৃথিবীর এই অঞ্চলে ছিলো, এতটাই যে সেই সংস্করনের খেলাটির আসল তারিখ ছিল ২০২০, দুইটি স্বাগতিক দলের টুর্নামেন্টটি আয়োজক হবার কথা ছিল- আর্জেন্টিনা ও কলম্বিয়া। এই ক্ষেত্রে অনেক বাধা ছিলো , স্বাস্থ্যগত, অবকাঠামো ও লজিস্টিক এর ক্ষেত্রে ব্যর্থতার দরুন আর্জেন্টিনা ও কলম্বিয়াতে প্রতিযোগিতাটি হবে কিনা সংশয় দেখা গিয়েছিল। ব্রাজিলের সরকার সেই সময় প্রতিযোগিতাটি তাদের দেশে করার প্রস্তাব দেয় এবং সেটা এইভাবেই ব্রাজিলে হয়।

এই সময়টায় আর্জেন্টিনা অনেক বেশি নিষ্ক্রিয় ছিল – মনে হচ্ছিলো তারা যেনো কুম্ভকর্ণের ঘুমে নিমজ্জমান। তারা ২০১৯ সালের ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে হেরে এসেছিল। ক্রমান্নয়ে ফাইনাল হারের বিপর্যয়ের রেশ নিয়ে তারা এইখানে এসেছিল- প্রথমে ২০১৪ এর ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনাল, তারপর ২০১৫ চিলি কোপা আমেরিকা, তারপর ২০১৬ শতাব্দীর কোপা আমেরিকা ইউএসএ। সেই প্রজন্মের খেলোয়াড় হিসাবে খেলেছিলেন মেসি, ডি মারিয়া, আগুয়েরও, হিগুয়েন, মাসচুরানও এবং তারা প্রচুর বাজে কথার স্বীকার হয়েছিলেন, সাংবাদিকমহল তাদের ধুয়ে দিয়েছিলো, জনগন থেকে তাদের দুরত্ব অনেক বেড়ে গিয়েছিল। যাই হোক, নেতৃত্বের পালাবদল, দলের হেড কোচ লিওনাল স্ক্যালোনির নতুন চ্যালেঞ্জ ছিলো তার কোচিং প্যানেলে সব তরুণ কোচ নিয়ে কাজ করা যারা আগেও জাতীয় দলের হয়ে কাজ করেছিলেন যেমন- পাবলো আইমার যিনি জাতীয় দলে আগে সংযুক্ত ছিলো যিনি আইডিয়া গুলো বাস্তবায়ন করেছিলেন এবং তিনি ‘পুরনো গার্ড ‘ হিসাবে আবারও সুযোগ পান , মাথায় রাখা হয়েছিল বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ, “ফিদেও”এল “কুন” ( এই সময় পর্যন্ত) ও ওটামেন্ডি এরা দলকে অক্সিজেন দিতে পারবে ও সঠিক পথে আনবে । এইযে লম্বা সময় ধরে ঘুমিয়ে থাকা এখান থেকে জাগা শুরু করেছিল যেটা আমরা বলেছিলাম , একটি আয়কনিক স্টেডিয়াম মারাকোনাতে যেটি কিনা হাজার কিলোমিটার্স থেকে দূরে, আমাদেরকে আবার পুনরায় একত্রিত করেছিল একটা সমাজে যেই সমাজ অনেকবছর ধরে কোনো ট্রফি না জিতার হতাশা নিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছিল ।

এই চিত্র এর প্রতিচ্ছবি আমরা পরবর্তীতে জানতে পেরেছিলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডকুমেন্টারিগুলোর দ্বারা । উৎসাহব্যঞ্জক বক্তৃতায় অধিনায়ক লিওনেল মেসি তার সতীর্ধদের বলছিলেন, আমি তোমাদেরকে ধন্যবাদ জানাতে চাই , বন্ধুরা । এই ৪৫ দিনের জন্য আমি তোমাদের ধন্যবাদ দিতে চাই। আমি আমার জন্মদিনে তোমাদের বলেছিলাম- আমরা একটি অতি চমৎকার দল হিসেবে একত্রিত হয়েছি, একটি সুন্দর দল ও আমি অনেক অনেক উপভোগ করেছিলাম। এই ৪৫ দিন আমরা কোনো ভ্রমণ নিয়ে, কোনো খাবার নিয়ে, হোটেল নিয়ে, মাঠ নিয়ে কোনো ধরনের কোনো অভিযোগ করি নি । ৪৫ দিন আমাদের পরিবারকে না দেখারও অভিযোগ করি নি। মেসি আবেগ- উত্তেজনাপূর্ণ কণ্ঠে বর্ণনা দিয়েছিল। তারপর আরও যোগ করেছিল- এই আলাপচারিতার সবচেয়ে আবেগঘন অংশ হচ্ছে- মেসি পেস্ট্রি এর মাঝে ফল যোগ করছে এই কথাগুলো বলার দ্বারা- সর্বশেষ, এটা কোনো কাকতালীয় নয়, বন্ধুরা। এই কাপটি আর্জেন্টিনায়ই থাকার কথা ছিলো, সৃষ্টিকর্তা এখানে এনে দিয়ে গিয়েছে, যেটা কিনা আমরা শুরু করেছি মারাকানাতে। যা কিনা অনেক সুন্দর সবার জন্য যার দরুন সবাই আত্মবিশ্বাসী ও শান্ত-মেজাজী যে এটা আমরা আমাদের বাসায় নিয়ে যাবো। এবং এইভাবেই হয়েছিল, আমরা সবাই জানতাম আমাদের ব্যথার কথা, একটি কন্টক গোলাপ যে আমাদের হৃদয়ে যে পরিস্ফুটিত হয়েছিল ব্রাজিল ওয়ার্ল্ড কাপে অতিরিক্ত সময়ের গোলের দারা ১-০ ব্যবধানে হেরে । এরপর থেকে জাতীয় দল নানান প্রশ্নের সম্মুখীন ছিলো যেহেতু আমরা আর্জেনটাইনরা প্রাকৃতিকগতভাবে অনেক বেশি আমাদের ফুটবলের ক্লাবগুলোর সর্মথক- যেমন – রিভার , বোকা কিন্তু জাতীয়দলে নিম্নমুখী ফলাফল , আশাও দিন দিন তলানিতে যাচ্ছিলো, কিন্তু এটাও বিদ্যমান ছিলো পজিটিভ মনোভাব কারন আমরা বিশ্বাস করি, ‘আমরা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ’ ও অন্যভাবে বলা যায় “ নৈতিকভাবে চ্যাম্পিয়ন” আর তাছাড়া, এই ভাঙনের সুর জোরা লাগানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০১৪ এর রানার্স আপ হবার পর থেকে কেননা ফ্যানরা পুনরায় তাদের দলের প্রতি বিশ্বাস করা শুরু করেছিল।

কিন্তু এই সুখ ছিলো ক্ষণস্থায়ী, সত্যি বলতে, কেননা আমাদের মতো ফুটবল পাগল জাতির জন্য পর পর ৩টি ফাইনাল হারার ব্যথা ও রাশিয়া বিশ্বকাপের খুব বাজে পারফরমেন্স সহ্য করার ক্ষমতা জানা ছিলো না । এই কাটা বপণ হয়েছিল ২০১৪ এর মারকানাতে এবং আমরা আমাদের জাতীয় দল থেকে দূরে চলে গেছিলাম , সাত বছর পর এর থেকে ভালো আর কী হতে পারে মারাকানাতে আমরা আবার আমাদের হারানো রঙ ফিরে পেয়েছি। সেই কোপা আমেরিকা ২০২১ পাবার মাধ্যমে একটি রোমান্টিক ভিক্তিপ্রস্থর তৈরি হলো যা শেষ হয়েছিল দেশের সবার ১৮ ডিসেম্বর ২০২২এ যেয়ে , প্রায় দেড় বছর পর। সমগ্র বেদনা আরোগ্য লাভ করে লুসালি স্টেডিয়ামে গঞ্জালো মন্টিয়েলের পেনাল্টি এর মাধ্যমে । স্বীকৃতি লাভ করে বিখ্যাত কথার মাধমে – এইযে আমাদের , এইযে আমাদের। যেটা কিনা পড়তে পারছিলাম মেসির ঠোঁটগুলোর দ্বারা যখন সে তার পরিবারের সাথে দেখা করার জন্য গ্যালারি এর দিকে ছুটছিলেন। যেটা হয়েছিল ডিসেম্বরের এই বিকালে সেটা হলো একটি বিশ্বস্ত প্রতিফলন, অন্তহীন আবেগের নিখুঁত উধারন, যা কিনা যেকোনো শব্দে যেকোনো বর্ণমালায় প্রকাশ করা অসম্ভব। কারন সেইদিন প্রায় ৫ মিলিয়নের চেয়ে বেশি লোক আর্জেটিনার বুয়েনস আইরেস, কর্দোবা, সান্তা ফে, মেন্ডোজা, সালতা, টিয়েররা ডেল ফুয়েগও সহ অন্যান্য সকল অঞ্চলের রাস্তায় জনসমুদ্রে পরিনীত হয়েছিল ও তাদের সবার গলায় একটি সুর – আমরা বিশ্বচ্যাম্পিওন।

শুধু ফুটবল ক্লাব সমর্থকরাই রাস্তায় নামেননি, সাধারণ মানুষও মাঠে নামেন। আমরা সবাই একে অপরকে আলিঙ্গন করতে বেরিয়ে পড়লাম, নারী, শিশু, সব শ্রেণি-পেশার বয়সের পুরুষ। আলিঙ্গন আমাদের আবেগের প্রতীক, এটি আর্জেন্টাইনদের জন্য “আমি তোমাকে ভালোবাসি” বলার একটি উপায় যার সহজাত উৎপত্তি ইতালীয়দের স্নেহময় উষ্ণতার মাধ্যমে এবং স্প্যানিশদের নস্টালজিয়া দারা । এবং বছরের পর বছর ধরে, এবং আমাদের প্রদেশগুলির শিকড়ের সাথে, বিশ্বের এই অনন্য সংস্কৃতিটি তৈরি করা হয়েছিল যেখানে আলিঙ্গন হল স্বীকৃতি দেওয়ার একটি উপায় যে আমরা একে অপরকে ভালবাসি, আমরা একটি খেলাধুলার প্রেমে পড়েছি এবং আমরা অন্তত জানি না কেনো এই প্রেমে পড়েছি কিন্তু তারপরেও কেন জানি আমরা এই প্রশ্নের উত্তর দিতেও আগ্রহী নয়। এটা শুধু ঘটে। সেদিন আমরা সবাই অপরিচিত লোকদেরকেও এমনভাবে একে অপরকে আলিঙ্গন করেছিলাম,মনে হোসছিল এরা আমাদের পরিবার এবং বন্ধুদের মতো। আর্জেন্টাইনদের সর্বদা শারীরিক ইস্পোর্শো প্রয়োজন, মাঠের স্ট্যান্ডে থাকার, ভিজার সময় বা সূর্যের অটল রোদে মুখখানি উত্তপ্ত থাকুক, তাঁকে তার মাঠে থাকতেই হবে। তাকে সপ্তাহে একদিন হলেও ফুটবল সম্পর্কে কথা বলতে হবে, কোনটি সঠিক বা কোনটি ভুল তা নিয়ে বিতর্ক চালিয়ে যেতে রাতের খাবারের পরে কথোপকথন প্রয়োজন, এমনকি এটি জেনেও যে যুক্তিগুলি কখনও কখনও একটি অবস্থান সমর্থন করার জন্য যথেষ্ট নয় তাও তাদের ফুটবল নিয়ে পড়ে থাকতে হবে। ফুটবল আমাদের জীবনের একটি অবিশ্ছেদ্য অংশ যেইখানে আনন্দও রয়েছে কান্নাও রয়েছে। আমরা কেনো ফুটবলকে ভালোবাসি এতো তার কোনো বেখখা কেউ হয়তো দিতে পারবে না কিন্তু এই ব্যপারে সবাই একমত হবে যে আমরা ফুটবলকে অনেক বেশি ভালোবাসি ক্ষেত্রবিশেষএ প্রাণের থেকেও বেশি । ফুটবলের কারনে অনেক সময় আমাদের নিজেদের মাঝে হাতাহাতি হয় এটা যেমন সত্যি আবার এই ফুটবলই আমাদের ভালোবাসার শক্তি আমাদের বাচাঁর শক্তি। এবং সেই একই ঘটনা ঘটেছিল ১৮ ডিসেম্বর, ২০২২-এ, একদিনের জন্য আমরা একতাবদ্ধ ছিলাম, সবাই মিলে চিৎকার করে বলেছিলাম: “আমরা বিশ্বের সেরা। আমরা আর্জেন্টিনা।”

অতিথি লেখক: আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস থেকে আগস্টিন বাড়বেইতো , ইএসপিএন আর্জেন্টিনা ( ESPN, Argentina ), অনুবাদে – মোহাম্মদ নেহাল আবেদীন তন্ময়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *