প্রত্যেক সফল ব্যক্তি এবং তার অর্জিত সাফল্যের কাহিনী সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক যা শুনতে রূপকথার গল্পের মতো লাগলেও এর বাস্তব উপলব্ধি অনেক তিক্ত হয়ে থাকে। কারন, এই সাফল্যের পেছনে অব্যক্ত থাকে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও কঠোর পরিশ্রমের গল্প যেগুলো বেশীরভাগ সময়ই আড়ালেই থেকে যায়। পরিশ্রম কখনো বিফলে যায় না। সততা, ইচ্ছা এবং কঠোর পরিশ্রমের মানষিকতা একদিন না একদিন মানুষকে তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌছে দেয়ই। ঠিক এমনই এক হার না মানা যোদ্ধা হলেন তরুন ফুটবলার আলামিন, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশ এফসি’র ফরোয়ার্ড ফুটবলার হিসেবে খেলেন।
২০০৪ সালের ২৯ মার্চ উত্তরবঙ্গের নীলফামারি জেলার সদরে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন মোহাম্মদ আলামিন। তার বেড়ে ওঠার মাঝেই সন্তানকে নিয়ে বাবা আমিনুর রহমান এবং মা আমিনা বেগমের ছিল বিচিত্র পরিকল্পনা। আমিনুর রহমান চাইতেন তার ছেলে ফুটবল খেলুক আর মায়ের স্বপ্ন ছেলে মস্তবড় ক্রিকেটার হোক। তবে , আলামিনের ফুটবলের প্রতিই টান টা ছিল বেশি তাই সে সুযোগ পেলেই চলে যেত ফুটবল মাঠে। তার মা ব্যাপারটা মোটেও পছন্দ করতেন না, এমনকি মাঝেমাঝে এই কারনে তার খাওয়াও বন্ধ রাখতেন। এতকিছুর পরেও ফুটবল থেকে তিনি পিছপা হননি। তবে, এই বিষয়ে তার বাবার সায় ছিল যার ফলে তার গতিপথ পুরোপুরি মন্থর হয়নি। তার বাবা আমিনুর রহমান চাকরি করতেন স্থানীয় একটি “ছ”মিলে। ফুটবল সম্পর্কে তার বিস্তর কোনো ধারণা না থাকলেও ছেলের ফুটবল ক্যারিয়ার নিয়ে তার স্বপ্ন ছিল আকাশচুম্বী।আলামিন পড়াশোনা বেশীদূর করেননি। ফুটবলের ক্যারিয়ার গোছাতে গিয়ে দশম শ্রেনী পর্যন্ত আগাতে পেরেছেন তিনি। তবে ফুটবলে তিনি ছিলেন চাঙ্গা। ফুটবলে তার ব্যস্ত ক্যারিয়ারের প্রবেশদ্বার হলো যশোরের শামসুল হুদা ফুটবল একাডেমি। সেখান থেকেই ২০১৮ সালে সুযোগ পান বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ সাফ ফুটবল দলে। একই বছর থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত উয়েফা অনূর্ধ্ব-১৬ আসরে তিনি লাল-সবুজ জার্সিতে মাঠে নামেন সাইপ্রাস ও মালদ্বীপের বিপক্ষে। ২০১৯ সালে সুযোগ পান “ক্লিয়ার মেন অনূর্ধ্ব-১৭ স্কুল ফুটবল” টুর্নামেন্টে এবং টুর্নামেন্টের সেরা ছয় খেলোয়াড়ের মধ্যে নির্বাচিত হন তিনি। সেই সুবাদে ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির সাথে প্রশিক্ষণের সুযোগ পান।
তবে, করোনা ভাইরাসের মহামারির কারনে সুযোগটি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। ২০ বছরের আল আমিন শুধু স্ট্রাইকার পজিশনে না, খেলতে পারেন উইঙ্গার, মিডফিল্ডার হিসেবেও। এমনকি বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় দলে রাইট ব্যাক হিসেবেও নিজের প্রতিভার প্রমাণ দিয়েছেন। তাকে বলা হয় সব্যসাচী ফুটবলার। ক্লাব ক্যারিয়ারে শুরুর দিকে খেলেছেন আরামবাগ কেএস এর হয়ে, সেখানে খেলেছেন লেফটব্যাকে, মাঝে মধ্যে লেফটউইংয়েও খেলিয়েছেন ক্লাবের কোচ। তবে তার বাবার ইচ্ছা ছিল, তিনি যেন স্ট্রাইকারে খেলেন। এলাকার টিমে তিনি অবশ্য বেশিরভাগ সময়ই ফরোয়ার্ড পজিশনেই খেলেছেন। এই ক্লাবেই তার অভিষেক হয় বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ ফুটবলে। তবে, নিজের অভিষেক আসরই যেন দুঃস্বপ্নে পরিনত হয় আলামিনের জন্য। ২০২১ সালের আগস্টে, আল-আমিন আরামবাগ কেএসের ১৩ জন ফুটবলারের মধ্যে একজন ছিলেন যাদেরকে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের কারণে বাফুফে প্রাথমিকভাবে তিন বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল । পরে ফিফা এই নিষেধাজ্ঞা কমিয়ে এক বছর করে। তবে, আলামিন দাবি করেন তার উপরে আনীত এই অভিযোগ মিথ্যা ছিল। নিজের ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরুটাই এমন শেষ প্রান্তে এমন নিভু নিভু অবস্থা আলামিনকে মানসিক যন্ত্রনায় ফেলে দেয়। তবে , তিনি হেরে যাবার পাত্র ছিলেন না। নিজেকে আরো দৃঢ় প্রত্যয়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন আলামিন। একই সময়ে তিনি সাড়া পান তার অতীতের স্মৃতিবিজরিত শামসুল হুদা ফুটবল একাডেমি থেকে এবং ফিরে যান সেখানেই। এই দীর্ঘ সময় তিনি পরিশ্রম করে নিজের প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখেন এবং অবশেষে ২০২৩ সালের অক্টোবরে শেখ জামাল ডিসিতে যোগদান করেন। ধানমন্ডি ভিত্তিক ক্লাবে, কোচ জুলফিকার মাহমুদ মিন্টু তাকে একজন রাইট-উইঙ্গার হিসেবে নিযুক্ত করেন এবং তিনি ১২টি লীগে অংশগ্রহণ করেন।

চলতি মৌসুমে বাংলাদেশ পুলিশের হয়ে আল আমিনের খেলারই কথা ছিল না। তার চুক্তি ছিল শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের সঙ্গে। কিন্তু ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে শেখ জামাল গুটিয়ে নিয়েছে ফুটবল কার্যক্রম। সুযোগে তাকে লুফে নেয় বাংলাদেশ পুলিশ। ২৯ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে, আলামিন বাংলাদেশ পুলিশ এফসির হয়ে ২০২৪-২৫ প্রিমিয়ার লিগের প্রথম ম্যাচে ব্রাদার্স ইউনিয়নের বিপক্ষে অভিষেক করেন । ৭ ডিসেম্বর, তিনি তার প্রথম পেশাদার গোলটি করেন। ফকিরেরপুল ওয়াইএমসির বিপক্ষে জোড়া গোল করে ৪-১ ব্যবধানে জয়লাভ করেন। ১৪ ডিসেম্বর পরবর্তী লীগ ম্যাচে, সেন্টার-ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলে আলামিন ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের বিপক্ষে আরও দুটি গোল করেন যার ফলে পুলিশ এফসি ৪-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে। এছাড়াও ফেডারেশন কাপে তিনি বসুন্ধরা কিংস এর বিপক্ষে জোড়া গোল করেছেন। প্রথম ফেইজ শেষে এবার বিপিএল এ মোট ৭ টি ও ফেডারেশন কাপে ২টি মিলিয়ে সর্বমোট ৯ গোল আলামিনের দখলে, যা দেশীয় খেলোয়াড়দের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং লীগ টেবিলে ২য় সর্বোচ্চ স্থানের তকমা দিয়েছে তাকে।

এরই মাঝে গত ১১ই ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় পুলিশ এফসির হয়ে অনুশীলন করে এসে এক সংবাদ কর্মীর কাছে নিজের জাতীয় দলে জায়গা করে নেয়ার খবরটি প্রথম শুনতে পান আলামিন। তারপর খোঁজখবর নিয়ে সত্যতা মিলে গেলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান ২১ বছর বয়সী এই ফুটবলার। তিনি বলেছেন, ‘এই দিনটির জন্যই অপেক্ষায় ছিলাম। জাতীয় দলে কে না খেলতে চায়। আমি কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছি। হয়তো সেই ফল পেয়েছি। আমিসহ আমার পুরো পরিবার অনেক খুশি। আল আমিনের বাবা আমিনুর রহমান ছেলের জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার খবর শুনে গ্রামে মিষ্টি বিলিয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে আলামিন মনে করেন , কঠোর পরিশ্রমই আসলে সফলতার মূল। কঠোর পরিশ্রমের আইডল হিসেবে মানেন ক্রিস্টিয়ান রোনালদো কে। সেই সাথে তিনি কৃতজ্ঞতের সাথে স্মরণ করেন নিজ টিম পুলিশ এফসি এর বর্তমান সহকারী কোচ মাহবুবুর রহমান জুয়েল কে, যার তত্ত্বাবধানে এই চমোকপ্রদ পারফর্মেন্স করেছেন বিপিএল ও ফেডারেশন কাপে।


