ক্রিকেট খেলা আসলে উপমহাদেশের জন্য, কিন্তু দূর্ঘটনাবশত খেলাটির জনক ব্রিটিশরা৷ আপনি যতোই বলুন না কেন – খেলার সাথে রাজনীতি মেশাবেন না। কথাটা উপমহাদেশে প্রযোজ্য না। এ দেশে ক্রিকেটের চাইতেও রাজনীতি চর্চা হয় বেশি।
-ভারতীয় আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক আশীষ নন্দী
আমরা হরহামেশাই চারপাশে শুনতে পাই “খেলার সাথে রাজনীতি মেশাবেন/মেশাবি না”। কিন্ত আত্মদ্বন্ধে বিস্মৃত আমরা ভুলে যাই যে, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক বিষয়গুলো যেমন রাজনীতির সাথে জড়িত ঠিক তেমনি খেলাধুলাও এর বাহিরের কোন বিষয় না। এই যেমন ক্রিকেটেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দুই রাজনীতিরই প্রভাব রয়েছে। কয়েকটা ঘটনার রেখাপাত টেনে ব্যাপারটি জেনে নেয়া যাক।
১৯৭১ সালে যে পাকিস্তান আমাদের উপর নির্যাতন চালিয়েছে সেই পাকিস্তান এখনো আমাদের কাছে ক্ষমা চায়নি। তাই, কোন বাংলাদেশি যদি এদেশেরই কোন স্টেডিয়ামে বসে পাকিস্তানের পতাকা হাতে উল্লাস করে তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে দ্বিচারিতা এবং শহিহদের আত্নত্যাগের প্রতি অমর্যাদার। একটা বিশাল সময় জুড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে পারেনি। দেশটি লম্বা একটা সময় ধরে নিষেধাজ্ঞার কবলে ছিলো। আর এর কারণ হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি; সেখানে ওই সময়ে বর্ণবাদ প্রচলিত ছিল আর এই বর্ণবাদের কারণ দেখিয়ে তাদের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা থেকে বহিষ্কার করা হয়। পাকিস্তানে বর্তমানে আন্তর্জাতিক কোন ক্রিকেট খেলা হয় না, এর কারণ সেখানকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক অস্থিরতা!

এতো গেলো দেশগুলোর জাতীয় রাজনীতির একটা প্রভাব। আন্তর্জাতিক রাজনীতিও যে কোথাও কম যায় না, সেটি দেখা যায় ভারত ও পাকিস্তান এক দেশ আরেক দেশে একটা দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে যায়নি। আর এর কারণ হচ্ছে, দেশ দুইটির মাঝে সম্পর্ক ভালো না। এমনকি ভারতের আইপিএলে তাবত পৃথিবীর সব দেশের খেলোয়াড়রা এসে খেলে যেতে পারলেও পাকিস্তানের খেলোয়াড়রা সেখানে স্থান পান না। আর এর কারণ কিন্তু কেবল ক্রিকেট না বরং রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েন!
পিং পং ডিপ্লোম্যাসিঃ স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসির উতকৃষ্ট উদাহরণ
১৯৭১ সালের পিংপং ডিপ্লোম্যাসির কথাই ধরা যাক। ঘটনার সূত্রপাত সেই ১৯৪৯ সালে, যখন মাও সে তুঙ চীনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটালেন। পুঁজিবাদে গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না, তা তো বলাই বাহুল্য। এর সাথে যোগ হয়েছিল স্নায়ুযুদ্ধকে কেন্দ্র করে ছড়ানো বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা, চীনের উপর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আর কূটনৈতিক নীরবতা। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক একদম তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন কোরিয়া যুদ্ধের ময়দানে পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিল বটে, কিন্তু তাদের মধ্যকার সম্পর্কের এতটাই অবনতি ঘটেছিল যে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিনিধি চীনের মাটিতে পা রাখেনি।
তবে সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কের এই দূরত্ব ঘুচে যেতে থাকে। ১৯৭১ সাল নাগাদ বিশ্ব রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসে। ততদিনে চীনের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্কে চিড় ধরেছে। সীমান্তে বেশ কয়েকটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ফলস্বরূপ দুই সমাজতান্ত্রিক দেশ ক্রমশই একে অপরের শত্রুতে পরিণত হচ্ছে। এমন এক অবস্থায় চীনের চেয়ারম্যান মাও ভাবতে শুরু করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন করে সম্পর্ক স্থাপন করলে বোধহয় রাশিয়ানদেরকে উচিত শিক্ষা দেয়া যাবে।
অপরদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের মনেও অভিন্ন চিন্তা খেলা করছিল। তিনিও তার প্রশাসনে চীনের সাথে সম্পর্ক জোড়া লাগানোকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নকে এক হাত নিতে চীনের সাথে জোট গঠনের মতো ভালো উপায় যে আর কিছুই হতে পারে না! ১৯৬৭ সালে তো তিনি একবার লিখেছিলেনও, “আমাদের পক্ষে চিরদিন চীনকে রাষ্ট্র-পরিবারের বাইরে রাখা একেবারেই সম্ভব নয়।”
ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দুই তরফ থেকেই কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন করে শুরুর তাগিদ অনুভব করা যাচ্ছিল। দুই দেশের কূটনীতিকরা গোপনে একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করতে শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত রকমের কোনো ‘মাইলফলক সৃষ্টিকারী’ ঘটনা ঘটছিল না, যার মাধ্যমে রাতারাতি সকল ধোঁয়াশা, সকল জটিলতা দূর হয়ে যাবে।

অবশেষে রীতিমতো অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই সেই ‘ব্রেক-থ্রু’র আগমন ঘটলো পিংপং খেলোয়াড়দের একটি সৌজন্য সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে। তখন জাপানের নাগোয়াতে ১৯৭১ বিশ্ব টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপ চলছে। চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুঙয়ের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে চীন সফর করে যুক্তরাষ্ট্র পিংপং দল। পরের বছর ফিরতি আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র যায় চীনা পিংপং দল। এর মাধ্যমে অবসান ঘটে ২০ বছর ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-চীন কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের, এবং নতুন করে দুই রাষ্ট্রের মাঝে বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। পিংপং খেলাকে কেন্দ্র করে দুই রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছিল বলে একে ‘পিংপং ডিপ্লোম্যাসি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল চীনের উপর ২০ বছর ধরে থাকা ভ্রমণ ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭১ সালের অক্টোবরে ভোটের মাধ্যমে জাতিসংঘে বৈধ পদ লাভ করে চীন। পাশাপাশি তারা খুবই অল্প সময়ের মধ্যেই অন্যান্য দেশগুলোর সাথেও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে সক্ষম হয়।
খেলা ও জাতীয়তাবাদ
খেলার সাথে জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক রয়েছে প্রবলভাবে। ১৯৭২ সালে মিউনিখে অলিম্পিকের মাঠ হয়ে গিয়েছিল জাতীয়বাদী আন্দোলনের মাঠ। সেই অলিম্পিকে ফিলিস্তিনিদের হাতে নিহত হয় ইসরায়েলের খেলোয়াড়েরা। স্নায়ুযুদ্ধের পুরোটা সময় খেলা ছিল আন্তজার্তিক বাইপোলার চরিত্রাবলম্বনের দৃশ্যপট, যেকোন খেলা যেন ভাগ হয়ে যেত আমেরিকা আর সোভিয়েত শিবিরে। ই খেলাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের যুদ্ধেরও ইতিহাস আছে। ১৯৬৯ সালে হন্ডুরাস আর এল সালভাদরের মাঝে যুদ্ধ হয়েছিল একটা ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে৷ ইতিহাসে সে যুদ্ধ ‘১০০ ঘন্টার যুদ্ধ’ নামে পরিচিত ৷ বিখ্যাত এশেজে মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া আর সেটিও কিন্তু পরস্পর জাতিগত মর্যাদার লড়াইয়ে খেলে। ঔপনিবেশিক কাল থেকে খেলা যে একটি জাতির পরিচয় নির্মাণের হাতিয়ার হয়ে আসছে সেটির মোক্ষম এক উদাহরণ ভারতীয় ‘লগান’ ছবিটা। ফুটবল বিশ্বকাপ – দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে মাঠে ৯০ মিনিটে দুই দেশের ফুটবল চর্চার বাইরেও স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ফুটে ওঠে দুই দেশের জাতিগত বিদ্বেষ। আর ক্রিকেটে উপমহাদেশে এই জিনিসটা চলে গিয়েছে অন্য এক পর্যায়ে। বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচে স্ট্যান্ডে বাংলাদেশি দর্শকরা ‘ম্যারি মি আফ্রিদি’ প্ল্যাকার্ড নিয়ে নাচানাচি করেছে কিছু কাল আগেও। আর এই ভারত পাকিস্তানের ক্রিকেটীয় পক্ষ বিপক্ষ নিয়ে দ্বন্দ্ব তাদের নিজ দেশ থেকে আমাদের দেশে বেশি হয়।
সাম্প্রতিক কাতার বিশ্বকাপ ও বিশ্ব রাজনীতি
ক্রিকেট ম্যাচ চলাকালে অনেককেই বলতে শোনা যায় খেলার সাথে রাজনীতি মেশাবেন না। অথচ ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত কাতার ফুটবল বিশ্বকাপ ছিল রাজনৈতিক দাবি আদায়ের, রাজনৈতিক ও বিশ্ব জনমত আদায়ের অন্যতম মাধ্যম। কাতার বিশ্বকাপে ফিলিস্তিন না খেললেও মুসলিম বিশ্ব এবং ফিলিস্তিনিরা ছুটে এসেছে পতাকা নিয়ে, বিশ্ব সম্প্রদায়কে জানিয়েছে তাদের প্রতি নির্যাতনের কথা । অন্যদিকে জার্মানির পুরো দল মুখে হাত দিয়ে ছবি তুলে প্রতিবাদ জানিয়েছে কাতার বিশ্বকাপের নানা ধরনের বিধিনিষেধের! আর ইরান ও যুক্তরাষ্টের ম্যাচ ছিল রীতিমতো ৩য় বিশ্বযুদ্ধের একটি আবহ।

বিশ্বগ্রামের এই যুগে খেলা রাজনীতি,প্রযুক্তি সব একে অপরের সাথে যুক্ত। আপনি না চাইলেও চলে আসবে। কিন্তু সমস্যা হবে যদি এই খেলার সাথে রাজনীতি মেশানোর মধ্যে বাড়াবাড়ি চলে আসে। সবাই রাজনৈতিকভাবে সমান সচেতন না – এটাই বাস্তবতা। এবং অনেকে যুদ্ধের ময়দানে কোনো দেশের বিরুদ্ধে থাকলেও খেলার শৈল্পিকতার কারণে ঐ দেশের টিমের সাপোর্টার হতেই পারে। তাদের সেই অধিকার থাকা উচিত।একদিকে “খেলার সাথে রাজনীতি মেশাবেন না” বলাটা যেমন বাস্তবতা বিবর্জিত উপদেশ, তেমনি অন্যদিকে কেউ যদি নিজের রাজনৈতিক প্রেফারেন্সটা অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে চায়, যদি বলে “অমুক দেশ তমুক দেশের সাথে এই অন্যায় করেছিল, কাজেই তাকে সাপোর্ট করা যাবে না।
তথ্যসূত্রঃ
১. Politics in cricket and cricket in politics (https://www.thedailystar.net/op-ed/politics/politics-cricket-and-cricket-politics-103012 )
২. পিংপং কূটনীতির ৫০ বছর (https://www.ajkerpatrika.com/পিংপং-কূটনীতির-৫০-বছর )
৩. Improbable Diplomats: How Ping-Pong Players, Musicians, and Scientists Remade U.S.-China Relations (https://www.ncuscr.org/tag/ping-pong-diplomacy/ )
৪. Ping‐Pong Diplomacy (https://www.nytimes.com/1971/04/10/archives/pingpong-diplomacy.html )
৫. When sport and nationalism collide on the pitch, and off it (https://timesofindia.indiatimes.com/blogs/voices/when-sport-and-nationalism-collide-on-the-pitch-and-off-it/ )
৬. The Tragedy of Pro-Palestinian Activism at the World Cup (https://foreignpolicy.com/2022/12/13/palestinian-flag-protest-world-cup-qatar-israel-abraham-accords/ )


