ব্রাজিলের জনশ্রুতিতে আছে যে, ব্রাজিলে কোন শিশু জন্ম নিলে প্রথমে তার বালিশের পাশে একটা ফুটবল রেখে দেয়া হতো যাতে ইশ্বরপ্রদত্ত গুণের মাধ্যমে তার ভিতর ফুটবলের নৈপুণ্যের আবির্ভাব হয়। পুরো দুনিয়াজুড়ে ফুটবল খেলার যে রাজত্ব তার সিংহভাগ অবদান রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দুটো দেশ ব্রাজিল আর্জেন্টিনার। শুধু খেলার গন্ডি পেরিয়ে ফুটবল মিশে আছে দুটি দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংষ্কৃতি, অর্থনীতির সাথে। শুধু খেলায়াড়দের ইউরোপের ক্লাবে খেলার মাধ্যমে প্রতিবছর মিলিয়ন ডলার ইনকাম করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। পেলে বলুন, মারাদোনা বলুক ব্রাজিলের অর্থনীতির ব্রান্ড হিসেবে এরা পূর্বেও যেমন ছিল, তারই ধারাবাহিকতা বয়ে চলেছে মেসি ও নেইমারদের মাধ্যমে। ফুটবল কিভাবে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার অর্থনীতিতে ভুমিকা রাখছে তা দেখে নেয়া যায়।
ব্রাজিল ও ফুটবলঃ খেলা যখন শিল্পের উৎস
ফুটবল একটি জাতীয় আবেগ। ব্রাজিলের সবাই কোনো না কোনো সময়ে এই শব্দগুচ্ছ শুনেছে। এবং এটি একটি অপ্রতিরোধ্য সত্য প্রকাশ করে। প্রকৃতপক্ষে, যদি লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশে সত্যিকারের জনপ্রিয় খেলা থাকে যা একই সাথে সমস্ত সামাজিক শ্রেণীর মানুষের আগ্রহকে আকর্ষণ করে, তবে তা হল ফুটবল। বিশেষ করে পুরুষরা ফুটবল পছন্দ করে এবং প্রায়শই বলে যে তারা তাদের ক্লাব সম্পর্কে উত্সাহী, তবে খেলাধুলায় আগ্রহী এবং স্টেডিয়ামে যাওয়া মহিলাদের সংখ্যায় স্পষ্ট বৃদ্ধি ঘটছে বর্তমানে।
ব্রাজিলের ফুটবল তার ক্রীড়াবিদদের পরিমার্জিত কৌশলের জন্য বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। ব্রাজিলের অনেক খেলোয়াড় বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উঠে এসেছেন, যার মধ্যে পেলে, প্রধানত, কিন্তু এছাড়াও গ্যারিঞ্চা, রিভেলিনো, রোনালদিনহো (রোনালদো ফেনোমেনো), রোনালদিনহো গাউচো, কাকা, রোমারিও, নেইমার, এমন অনেক মহান ক্রীড়াবিদদের মধ্যে যারা চলে গেছেন বা এখনও চলে গেছেন। কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ হিসেবে পরিচয় এবং অসাধারণ মূল্য ১।
ফুটবল অর্থনীতির ক্ষেত্রে দক্ষিণ আমেরিকার প্রেক্ষাপটে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, পেরু, কলম্বিয়া, চিলি ইত্যাদি দেশের কথা বলতে হবে। তবে এদের মধ্যে আবার এগিয়ে ব্রাজিল। সান্তোস, গ্রেমিও, সাও পাওলো, ভাস্কো দা গামা রেগাতাস ইত্যাদি ক্লাব গুলোর বার্ষিক আয় দেশটির অর্থনীতি ও জিডিপির অন্যতম খাত।

ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ইমপ্যাক্ট রিপোর্ট অনুসারে, ২০১৮ সালের ডেটা সহ ব্রাজিলের বার্ষিক রিপোর্টে প্রকাশিত, ব্রাজিলিয়ান জিডিপিতে 0.72% শেয়ার রয়েছে ব্রাজিলের ফুটবলের (Confederação Brasileira de Futebol [CBF], 2019)৷ এছাড়াও এই রিপোর্ট অনুসারে, ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ২০১৮ সালে ৫২.৯ বিলিয়ন জেনারেট করেছে এবং সেই সাথে প্রায় 156,000 কর্মসংস্থান তৈরি করেছে (CBF, 2019)। ব্রাজিলে ৭০০০ টিরও বেশি ক্লাব রয়েছে (যার মধ্যে ৮৭৪ টি সক্রিয় পেশাদার ক্লাব) এবং ৩৬০০০ এরও বেশি নিবন্ধিত ক্রীড়াবিদ রয়েছে৷ এগুলি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা, তবে তাদের উন্নত হওয়ার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে দেশের জিডিপিতে ফুটবল শিল্পের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে, যা তিনগুণ হতে পারে বলে মনে করছে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ক্লাব।

ব্রাজিলে ফুটবলকে ঘিরে গণমাধ্যম ও ব্রডকাস্ট চ্যালেনের উত্তোরোত্তর বৃদ্ধি ব্রাজিলের অর্থনীতিতে ফুটবলের প্রভাবের পরিচয় দেয়। ব্রাজিলের তথ্য মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট অনুসারে শুধু সঞ্চালনের মাধ্যমে চ্যালেন গুলোর বার্ষিক আয় ১.৫৬ বিলিয়ন ডলার।

রাজস্বের আরেকটি উৎস যা সময়ের সাথে সাথে গুরুত্ব পেয়েছে তা হল স্পনসরশিপ, বিশেষ করে তাদের ইউনিফর্মে স্পনসরদের ব্র্যান্ডের স্ট্যাম্পিং। এছাড়াও, অনেক ব্রাজিলিয়ান ক্লাব পদ্ধতিগতভাবে পেশাদার ক্রীড়াবিদদের বিক্রির মাধ্যমে রাজস্ব আয় করে, যা বিদেশে স্থানান্তরিত হওয়ার সাথে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মান পাওয়া যায়, বিশেষ করে ইউরোপে। এছাড়া বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে ব্রাজিলের প্রতিটি সেক্টরে হয় বিনিয়োগ যা ২০১৪ বিশ্বকাপ উপলক্ষে ব্রাজিলের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের চিত্র থেকে বুঝা যায়।

আর্জেন্টিনার অর্থনীতিতেঃ যাকে মেসি অর্থনীতি বলা হয়
আর্জেন্টিনা ফুটবলকে প্রায় একটি ধর্মের মতো বিবেচনা করে। ব্রিটিশ অভিবাসীরা দেশে আসার পর থেকেই আর্জেন্টাইনরা এই খেলাটিকে চেনে। তবে, এটি অন্যান্য কার্যক্রমের মতো জনপ্রিয় হবে না বলে মনে হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, প্রথমে এটি শুধুমাত্র বিশেষ স্কুলের মধ্যেই বাজানো হতো। ১৮৯২ সালে, প্রথম দল তৈরি করা হয়েছিল, ক্লাব অ্যাটলেটিকো বুয়েনস আইরেস আল প্যাসিফিকো, যদিও প্রথম খেলাটি ইতিমধ্যে ২৫ বছর আগে খেলা হয়েছিল।
ব্রিটিশরা আর্জেন্টিনার অভ্যন্তরে অর্থনীতিকে উন্নীত করেছিল। ধাতুবিদ্যা, পরিবহন এবং রেলপথ নির্মাণ শিল্পের বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য ছিল। কিন্তু তারা জনগণকে গরুর মূত্রাশয় থেকে তৈরি বলটিকে লাথি মারতে উত্সাহিত করেছিল। অবিশ্বাস্যভাবে গোলের সীমানা ছিল পাথর।
১৮৬৭ সালে হগ ভাইরা বুয়েনস আইরেস ফুটবল ক্লাব তৈরি করেছিলেন যা আর্জেন্টিনায় একটি নতুন যুগ শুরু করবে। একই বছরের জুনে দেশে প্রথম ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হয়। আর সেখানেই জন্ম নেয় আর্জেন্টিনার ফুটবল, যে ম্যাচে ০-৪ গোলে শেষ হয় কলোরাডো দলের পক্ষে। টমাস হগ আশ্বস্ত করেছিলেন যে এটি একটি সহজ এবং সস্তা বিনোদন ছিল; খুব কম লোকই জানত যে এটি একটি সমগ্র জাতির জন্য একটি জীবনযাত্রায় পরিণত হবে।
একটি গবেষণা উঠে এসেছে যে, যে দেশটি বিশ্বকাপ জিতবে সাধারণত টুর্নামেন্টের পর দেশটির উভয় প্রান্তিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অতিরিক্ত ০.২৫% বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে কিছুটা ভঙুর অর্থনীতির আর্জেন্টিনার হালে তাই পানি এসেছে ফুটবলে মেসিদের বিশ্বকাপ জেতার দরূন। ব্রাজিলের মত আর্জেন্টিনায় ও ফুটবল মানুষের আবেগ-উত্তেজনার অন্যতম অনুষঙ্গ। কখনো কখনো তা আবেগ ছাড়িয়ে বাস্তবতার নিরিখে পরিমাপ করা হয় অর্থনীতির সূচক দ্বারা। আর্জেন্টিনার জাতীয় অর্থনীতিতে যেমন এককভাবে প্রাধান্য রেখেছে ক্লাব ফুটবলগুলোর অর্জন, তেমনি অপর প্রান্ত তুলে ধরে আছে সর্বকালের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির ব্রান্ড ভ্যালু। তাই অনেক ফুটবল অর্থনীতিবিদ আর্জেন্টিনার অর্থনীতিকে মেসি ইকোনমি বলে থাকে। আর্জেন্টিনার রয়েছে বিখ্যাত অনেক ফুটবল ক্লাব যারা সাউথ আমেরিকান বিখ্যাত ফুটবল ক্লাবের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।

খেলাধুলা, বিশেষ করে ফুটবল, আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের একটি প্রধান উপাদান পরিচয় এর সাংস্কৃতিক মাত্রা ছাড়াও, পেশাদার ক্রীড়া একটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক গুরুত্ব – এবং পর্যবেক্ষকরা মনে করেন ভবিষ্যতে এটি আরো বৃদ্ধি পাবে। Bloomberg এর একটি গবেষনামতে, প্রতিবছর জিডিপির ৩.৬৫% আসে ফুটবলকেন্দ্রিক আয় থেকে। এর মধ্যে খেলোয়াড় বিক্রি, গনমাধ্যম, টিকেট বিক্রি এবং ফুটবল ক্লাব ও সহ-বাণিজ্যিক খাত অন্তর্ভুক্ত।
আর্জেন্টিনার অর্থনীতিতে ফুটবলের আবেদন এতই যে, বলা হয়েছে যে অর্থনীতির দুরবস্থা থাকার পরও আর্জেন্টিনার মানুষ চেয়েছে ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা জিতুক যাতে ৪৫০ কোটি টাকার পুরষ্কার আর্জেন্টিনার অর্থনীতিতে যোগ হয়।
আর্জেন্টাইন ফুটবল এসোশিয়েসন এর রিপোর্ট থেকে দেখা যায় আর্জেন্টাইন ফুটবল ক্লাবের বার্ষিক আয় গত কয়েকবছর ধরে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এছাড়া ফুটসাল, বিভাগীয় পর্যায়ে খেলা, ১ম বিভাগ, ২য় বিভাগ ইত্যাদি পর্যায়ের ফুটবল খেলায় দ্বারাও অর্থ জেনারেট হয়। তার উপর সঞ্চালন, টিকেট বিক্রি থেকেও একটা বড় অংশ আয় হয়। সর্বোপরি, আবেগ কিংবা আবেদন কখনো টাকার মূল্যে পরিমাপ করা যায়না। সেটা খেলার ক্ষেত্রে আরও প্রাসঙ্গিক। যার প্রমাণ মেলে আর্জেন্টিনার ৪০% বেশি দরিদ্রসীমার নিচে থাকা মানুষের ১০০% বেশি মূল্যস্ফীতির পর ও বিশ্বকাপ নিয়ে তাদের বিশ্বাস থেকে ৭। আর্জেন্টিনার মানুষের বিশ্বাস, মুদ্রাস্ফিতির হার তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছলে ক্রীড়া ক্ষেত্রে বড় সাফল্য আসে। কথায় আছে ফুটবল আর অর্থনীতি এক পথে হাটেনা। তবে একথাটি দক্ষিণ আমেরিকার এই দুটি দেশের ক্ষেত্রে অনেকটাই অমূলক।
তথ্যসূত্রঃ
World Cup Lifts Argentina’s Economic Mood https://www.bloomberg.com/news/newsletters/2022-12-24/world-cup-win-lifts-up-argentina-s-economic-mood-new-economy-saturday
The football business in Brazil: Connections between the economy, market and media https://doi.org/10.1590/S1980-65742014000200001
The Poor “Wealth” of Brazilian Football: How Poverty May Shape Skill and Expertise of Players https://www.frontiersin.org/articles/10.3389/fspor.2021.635241/full
Brazil: The Soccer Monopoly In South America https://www.forbes.com/sites/josephosullivan/2023/08/29/brazil-the-football-monopoly-in-south-america/?sh=3ec250c91d39
Brazilian football generated R$ 6,7 billion with transfers in the last 15 years https://www.sportsvalue.com.br/en/brazilian-football-generated-r-67-billion-with-transfers-in-the-last-15-years/
https://www.footballhistory.org/national/argentina.html
In Argentina, hopes for soccer glory overshadow economic woes https://www.morningbrew.com/daily/stories/2022/12/16/in-argentina-soccer-glory-overshadows-economic-woes


