২০২৫-এ ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের সাফল্য

এবছর বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন যেন নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, সীমাবদ্ধতার দেয়াল ভেঙে একের পর এক সাফল্যের গল্প লিখেছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। ক্রিকেট, ফুটবল, অ্যাথলেটিক্স থেকে শুরু করে আর্চারি ও দাবা সহ প্রায় প্রতিটি অঙ্গনেই বাংলাদেশের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর।

ফুটবল

 ফুটবলেএবছর নতুন করে আলো ছড়িয়েছে লাল-সবুজেরা। দীর্ঘদিন পর জাতীয় দল ও বয়সভিত্তিক দলগুলোর পারফরম্যান্সে ফিরেছে আশার আলো। পুরুষ দলের সবচেয়ে স্মরণীয় সাফল্য ছিল ১৮ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে ঢাকার মাঠে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিরুদ্ধে ১-০ গোলের ঐতিহাসিক জয়। শেখ মোরসালিনের একমাত্র গোলে আসা এই জয়টি ছিল ভারতের বিপক্ষে দীর্ঘ ২২ বছর পর বাংলাদেশের প্রথম বিজয়। এর আগে ২৫ মার্চ শিলংয়ে ভারতের বিপক্ষে প্রথম লেগের ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হয়েছিল। ২০২৭ এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের অন্য ম্যাচে বাংলাদেশ হংকংয়ের মাঠে ১-১ গোলে ড্র করে। ৫ ম্যাচে হামজার ৪ গোল ছিল দেখার মতো। আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের মধ্যে বাংলাদেশ ভুটানকে ২-০ গোলে হারিয়ে শুভ সূচনা করে এবং সেই সাথে নেপালের বিপক্ষে কাঠমান্ডু ও ঢাকা উভয় ভেন্যুতেই যথাক্রমে ০-০ ও ২-২ গোলে ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ।

অন্যদিকে, মিয়ানমারে এএফসি নারী এশিয়া কাপ বাছাইয়ে বাহরাইনাকে ৭-০ গোলে হারানোর পর মিয়ানমারকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। একইসাথে তুর্কমেনিস্তানকে ৭ গোলের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে বাঘিনীরা।

এছাড়াও, সাফ অনূর্ধ্ব-২০ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপ এ ১৮ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থেকে বাংলাদেশ ২০২৫-এর শিরোপা জিতেছে এবং এই আসরের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

ক্রিকেট

পুরুষদের ক্রিকেটে এবছর এশিয়া কাপে ট২০ তে বাংলাদেশ সুপার ফোরে কোয়ালিফাই করে। ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে সিরিজ জয় এবং বছরের শেষে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয়ের মাত্রা ছিল অন্যরকম যেখানে নিজের শততম টেস্টে সেঞ্চুরি করে এলিট প্যানেলে নাম লেখান মুশফিকুর রহিম। এছাড়াও, জুন-জুলাইয়ে শ্রীলঙ্কা সফরে টেস্ট সিরিজ হারলেও, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে জয় ছিনিয়ে আনে টাইগাররা। ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয়ও ছিল গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। দলগত অর্জনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও টুর্নামেন্টেও সাফল্য ছিল। বাংলাদেশ ‘এ’ দল রাইজিং স্টার্স এশিয়া কাপের ফাইনালে রানার্স-আপ হয় ।

 অন্যদিকে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে; তারা লাহোরে অনুষ্ঠিত বাছাইপর্বে অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপের টিকিট কাটে এবং মূল আসরে কলম্বোতে পাকিস্তানকে ৭ উইকেটে হারিয়ে নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয় তুলে নেয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ঐতিহাসিক ওয়ানডে জয় এবং ৩০টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচের মধ্যে ১৫টিতে জয়লাভ করা ছিল এ বছরের অন্যতম অর্জন।

ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে শারমিন আক্তার ও নিগার সুলতানা জ্যোতি উজ্জ্বল ছিলেন এবং মারুফা, রাবেয়া ও স্বর্ণা আক্তার ভারতের ডব্লিউপিএল (WPL) নিলামে জায়গা করে নিয়ে ইতিহাস গড়েন। এই গৌরবময় অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে প্রধান উপদেষ্টা দলটিকে ‘অপরাজিতা নারী পুরস্কার-২০২৫’ প্রদান করেন।

হকি

২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক হকিতে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। ভারতের তামিলনাড়ুতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২১ যুব হকি বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়াকে ৫-২ গোলে হারিয়ে বাংলাদেশ ঐতিহাসিক ‘চ্যালেঞ্জার ট্রফি’ জয় করে, যেখানে ১৮ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড গড়েন আমিরুল ইসলাম।

এছাড়া, হিরো এশিয়া কাপে কাজাখস্তানকে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত করে বাংলাদেশ, যেখানে ম্যাচসেরা হন রোমান সরকার। জাকার্তায় অনুষ্ঠিত এএইচএফ কাপেও সাফল্যের ধারা বজায় রেখে থাইল্যান্ডকে ২-১ গোলে পরাজিত করে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।

অ্যাথলেটিক্স, আর্চারি ও অন্যান্য

২০২৫ সালে অ্যাথলেটিক্স এ আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে দারুণ সাফল্যের সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশ । ভারতের রাঁচিতে অনুষ্ঠিত সাফ সিনিয়র অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ পুরুষ ও নারী রিলে দলসহ মোট ৩টি ব্রোঞ্জ পদক জয় করে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত সাফল্য আনেন ১৯ বছর বয়সী আর্চার আব্দুর রহমান আলিফ, যিনি সিঙ্গাপুরে এশিয়া কাপ আর্চারিতে রিকার্ভ ইভেন্টে স্বর্ণ পদক জয় করেন। ঘরোয়া আসরে ১৭তম জাতীয় সামার অ্যাথলেটিক্সে ইমরানুর রহমান ও সুমাইয়া দেওয়ান দ্রুততম মানব-মানবী হওয়ার গৌরব ধরে রাখেন। এছাড়াও, কম্পাউন্ড মিশ্র দ্বৈত ইভেন্টে হিমু বাছাড় ও বন্যা আক্তার জুটি ভারতের কাছে হেরে রৌপ্য পদক জেতেন। কুলসুম আক্তার কম্পাউন্ড নারী একক ইভেন্টে ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন।

টেবিল টেনিসে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য, বিশেষ করে ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে বাংলাদেশের জাভেদ আহমেদ ও খই খই মারমার মিশ্র দ্বৈত ইভেন্টে রৌপ্য পদক জয় একটি ঐতিহাসিক অর্জন, যা দেশের সেরা পারফরম্যান্সকে ছাড়িয়ে গেছে।  

এবছর দাবায় জাতীয় পর্যায়ে গ্র্যান্ড মাস্টার নিয়াজ মোরশেদ ৪৯তম জাতীয় দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ওয়াদিফা আহমেদ এশিয়ান জোনাল ৩.২ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে মহিলা বিশ্বকাপ ও মহিলা আন্তর্জাতিক মাস্টার খেতাব নিশ্চিত করেছেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এবছর বাংলাদেশের খেলাধুলায় সাফল্যের পেছনে ছিল আত্মবিশ্বাস, পরিকল্পনা এবং নতুন প্রজন্মের অদম্য ইচ্ছাশক্তি। সীমিত সুযোগ, অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মাঝেও ক্রীড়াবিদরা প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছা থাকলে পথ তৈরি হয়। এই বছরটি তাই বাংলাদেশের ক্রীড়াজাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *