কোচ আলফারো’র ম্যাজিকে ২০২৬ বিশ্বকাপ মঞ্চে প্যারাগুয়ে…


ফুটবল দুনিয়ায় কোচদের ভূমিকা সবসময়ই আলাদা মর্যাদা বহন করে। খেলোয়াড়রা মাঠে ঘাম ঝরালেও কৌশল নির্ধারণ, দলকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা এবং প্রতিপক্ষকে হারানোর পরিকল্পনা তৈরি করার কাজটি করেন কোচ। আর এই দিক দিয়ে প্যারাগুয়ের বর্তমান কোচ গুস্তাভো আলফারো নিজেকে অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরেছেন। আলফারোর জন্ম আর্জেন্টিনায়। তিনি নিজে একজন ফুটবলার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও আসল সাফল্য খুঁজে পান কোচিংয়ে। দীর্ঘদিন আর্জেন্টিনার ঘরোয়া ফুটবলে কোচিং করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে গুস্তাভো আলফারোকে দায়িত্ব দিয়েছিল ইকুয়েডর ফুটবল ফেডারেশন। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই তাদের মূল লক্ষ্য ছিল দলকে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা এবং বিশ্ব মঞ্চে সম্মানজনক পারফরম্যান্স নিশ্চিত করা। আলফারোর কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে রক্ষণভাগকে প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণ গড়ে তোলাই মূল পরিকল্পনা, যা ইকুয়েডরের খেলার ধরনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই স্বাগতিক কাতারকে ২-০ গোলে হারিয়ে সবার নজর কাড়ে ইকুয়েডর। দলের তারকা স্ট্রাইকার এনার ভ্যালেন্সিয়ার নেতৃত্বে আক্রমণভাগ যেমন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তেমনি রক্ষণভাগের শৃঙ্খলাও প্রশংসিত হয়। এরপর নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে লড়াই করে ড্র করে ইকুয়েডর, যা তাদের দৃঢ়তার বড় প্রমাণ। যদিও শেষ ম্যাচে সেনেগালের কাছে হেরে গ্রুপ পর্বেই বিদায় নিতে হয়, তবুও সমালোচকরা একবাক্যে স্বীকার করেন যে, আলফারো ইকুয়েডরকে এমনভাবে প্রস্তুত করেছিলেন যেন লাতিন আমেরিকার মাঝারি শক্তির দল হিসেবে বড় মঞ্চে আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। খেলোয়াড়দের মনস্তাত্ত্বিক দিক সামলানো, দলগত ঐক্য তৈরি এবং প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার কৌশল এসব দিক দিয়েই আলফারো প্রশংসিত হন বিশ্বজুড়ে।


২০২৩ সালে প্যারাগুয়ের জাতীয় দলের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকেই আলফারোর ওপর ভরসা করতে শুরু করে দেশটির ফুটবল মহল। দক্ষিণ আমেরিকান অঞ্চলে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব সবসময়ই কঠিন। এখানে প্রতিটি ম্যাচই যেন ফাইনালের মতো, কারণ প্রতিপক্ষদের মধ্যে রয়েছে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, উরুগুয়ে ও কলম্বিয়ার মতো বিশ্বমানের দল। এই চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে প্যারাগুয়ে বহু বছর ধরে পিছিয়ে পড়েছিল, বিশেষ করে ২০১০ বিশ্বকাপের পর আর বড় মঞ্চে উঠতে পারেনি।
আলফারো দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিন থেকেই গুরুত্ব দিয়েছেন দুটি বিষয়েঃ শৃঙ্খলা আর আত্মবিশ্বাস। তিনি বিশ্বাস করেন, ছোট ভুলই বড় পরাজয়ের কারণ হয়। তাই রক্ষণভাগকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি দ্রুত পাল্টা আক্রমণ গড়ার ওপর জোর দিচ্ছেন আলফারো। তাঁর কৌশলে এখন প্যারাগুয়ে একটি পরিশ্রমী ও লড়াকু দল হিসেবে গড়ে উঠছে। শুধু অভিজ্ঞ খেলোয়াড় নয়, তরুণ প্রতিভাবান ফুটবলারদেরও দলে সুযোগ দিচ্ছেন তিনি। এতে ভবিষ্যতের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াড গড়ে উঠছে।


প্যারাগুয়ের ফুটবল সমর্থকরা এখন আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন, আলফারোর ছোঁয়ায় হয়তো ২০২৬ বিশ্বকাপে দেখা যাবে তাদের প্রিয় দলকে। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলে যেখানে প্রতিটি পয়েন্টের জন্য যুদ্ধ করতে হয়, সেখানে আলফারোর অভিজ্ঞতা ও কৌশলই হতে পারে প্যারাগুয়ের ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি।
আলফারোর ফুটবল দর্শন খুব স্পষ্ট, “প্রথমে রক্ষণ, তারপর আক্রমণ”। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিপক্ষকে গোল থেকে বঞ্চিত করতে পারলেই ম্যাচ জেতার সুযোগ তৈরি হয়। তবে একইসঙ্গে তিনি প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড়দের তুলে আনার ওপরও জোর দেন। তাঁর অধীনে প্যারাগুয়ের বেশ কয়েকজন উদীয়মান ফুটবলার নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ পাচ্ছেন।


প্যারাগুয়ে শেষবার বিশ্বকাপে খেলেছিল ২০১০ সালে। এরপর থেকে বিশ্বকাপে জায়গা পেতে লড়াই করেও ব্যর্থ হয়েছে তারা। আলফারোর আগমনের পর সমর্থকদের নতুন করে স্বপ্ন জেগেছে ২০২৬ বিশ্বকাপেই আবার দলটিকে দেখা যাবে বড় মঞ্চে।
গুস্তাভো আলফারোর হাত ধরে প্যারাগুয়ে যদি আবার বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের হারানো জৌলুস ফিরে পায়, তবে বলা যায় এই আর্জেন্টাইন কোচই হবে দলের সত্যিকারের গেম-চেঞ্জার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *